‘অদৃশ্য’ ৩ হাসপাতালে চিকিৎসক নিয়োগ

জনপদ ডেস্কঃ নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা, সিদ্ধিরগঞ্জ ও আড়াইহাজারে ৩টি ২০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতাল খাতাকলমে থাকলেও বাস্তবে অস্তিত্ব নেই। ২০০৭ সালে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে এই হাসপাতাল ৩টির অনুমোদন দিলেও গত ১৪ বছরেও সেগুলো নির্মাণে কোনো সরকারি জায়গা অধিগ্রহণ করতে পারেননি সংশ্লিষ্টরা।

অথচ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তালিকায় নাম থাকায় অদৃশ্য ওই হাসপাতালের নামে এখনো চিকিৎসক নিয়োগ দেয়া হচ্ছে ১৪ বছর ধরেই। অদৃশ্য এই ৩টি হাসপাতাল ঠিক কবে নাগাদ নির্মাণ হবে কিংবা আদৌ হবে কিনা এমন প্রশ্নেরও সঠিক জবাব নেই স্বাস্থ্য বিভাগ কিংবা জেলা প্রশাসনের কারো কাছেই।

তথ্যানুসন্ধানে জানা গেছে, ২০০৬ সালের ৪ জুন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের (উন্নয়ন-২ শাখা) তৎকালীন সিনিয়র সহকারী সচিব আবেদা আক্তার স্বাক্ষরিত একটি চিঠিতে নারায়ণগঞ্জ সিভিল সার্জনকে ২০ শয্যা হাসপাতাল নির্মাণে স্থান নির্বাচন করে (কমপক্ষে ৩ একর) জমি অধিগ্রহণের লক্ষ্যে একটি প্রস্তাব প্রেরণের নির্দেশ দেন। এরপর ২০০৭ সালের ১৭ জুলাই এক আদেশে নারায়ণগঞ্জ জেলার ফতুল্লা ও সিদ্ধিরগঞ্জ এবং আড়াইহাজারে তিনটি ২০ শয্যার হাসপাতাল নির্মাণের জন্য অনুমোদন দেন স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন উপসচিব আবদুল্লাহ আল বাকী।

২০০৮ সালে একই মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন উপসচিব সুভাষ চন্দ্র সরকার স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে হাসপাতালগুলোর জন্য মেডিকেল অফিসার, ল্যাব টেকনিশিয়ান, ফার্মাসিস্ট, সিনিয়র স্টাফ নার্স, প্রধান সহকারী কাম হিসাব রক্ষকসহ মোট ৮টি পদ সৃষ্টি করার ঘোষণা দেয়া হয়। পাশাপাশি ওই চিঠিতে আউট সোর্সিংয়ের মাধ্যমে আরও ৫টি পদ নিয়োগেরও নির্দেশ দেয়া হয়েছিল।

এর মধ্যে আড়াইহাজারে ২০ শয্যার হাসপাতাল নির্মাণে একটি সরকারি জমি নির্ধারণ করে সেটি অধিগ্রহণের চেষ্টা করা হলেও জমি নিয়ে মামলা করায় সেটি আটকে আছে আদালতে।

জানা গেছে, এক যুগ ধরেই সেই মামলা চলমান রয়েছে। যদিও অদৃশ্য এই হাসপাতালে নিয়োগ রয়েছে একজন গাইনি কনসালটেন্টসহ ২ জন চিকিৎসকের।

অপরদিকে অনুমোদনের ১০ বছর পর ২০১৭ সালে নারায়ণগঞ্জের তৎকালীন জেলা সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ এহসানুল হক এক চিঠির মাধ্যমে নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে ফতুল্লা ও সিদ্ধিরগঞ্জ ২০ শয্যা হাসপাতাল নির্মাণের জন্য জায়গাসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে অনুরোধ করেন।

৩ বছর পরে ২০২০ সালের ২৬ আগস্ট জেলা ভূমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তা নুর এ আলম একটি চিঠিতে জেলা সিভিল সার্জন অফিসকে অবগত করেন, ফতুল্লা ২০ শয্যা হাসপাতাল নির্মাণের জন্য কাশীপুর এলাকায় জমি নির্বাচন করা হয়েছে। কিন্তু সিভিল সার্জন অফিস থেকে কোনো পূর্ণাঙ্গ প্রস্তাবনা না পাওয়ায় জমি অধিগ্রহণের কোনো কার্যক্রম গ্রহণ করা সম্ভব হয়নি।

পাশাপাশি ২০২০ সালের ২ সেপ্টেম্বর জেলা রেভিনিউ কালেক্টর (আরডিসি) আব্দুল মতিন খান প্রেরিত এক চিঠিতে জেলা সিভিল সার্জন অফিসকে বিষয়টির ব্যাপারে মতামতসহ প্রস্তাব প্রেরণেরও নির্দেশ দেয়া হয়েছিল। অপরদিকে সিদ্ধিরগঞ্জের হাসপাতালটির জন্য জমি অধিগ্রহণ তো দুরে থাক এখনও জমি নির্বাচন করারও কোনো প্রক্রিয়া গ্রহণ করা হয়নি বলে জানা গেছে।

স্থানীয়রা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, গত ১৪ বছরে পুরো জেলায় শতাধিক ব্যক্তি বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের নামে বহু সরকারি জমি লিজ নিয়ে রেখেছে। সেখানে ৩ টি হাসপাতালের জন্য সরকারি জমি খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না, এমনটি হাস্যকর।

তারা জানান, শিল্পনগরী নারায়ণগঞ্জের বিপুল সংখ্যক মানুষের স্বাস্থ্যসেবার চাহিদা মেটাতে রীতিমত হিমশিম খাচ্ছে ১০০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের চিকিৎসকরা। বর্তমানে ৩০০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতাল করোনার জন্য নির্ধারিত। তাই অন্যান্য সব চিকিৎসার জন্য ব্যবহৃত হচ্ছে কেবল ১০০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতালটি। বিশেষ করে শিল্প ও ঘনবসতিপূর্ণ নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার ফতুল্লা ও সিদ্ধিরগঞ্জ দুটি পৃথক থানা এলাকা। বিপুলসংখ্যক জনগোষ্ঠীর বসবাস এই ২টি থানা এলাকায় নেই কোনো সরকারি হাসপাতাল বা স্বাস্থ্য কেন্দ্র।

এ ব্যাপারে সদর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা জাহিদুল ইসলাম বলেন, আমি দায়িত্বে আসার পর জায়গার বিষয়ে জেলা প্রশাসক, সিভিল সার্জনসহ স্থানীয় সংসদ সদস্যের কাছে চিঠি দিয়েছি। কিন্তু ফতুল্লায় জায়গা মিলছে না। এক একর জায়গা পেলেও বহুতল ভবনের মাধ্যমে হাসপাতালটি করা যেত। তাও পাচ্ছি না।

তিনি জানান, ফতুল্লা ও সিদ্ধিরগঞ্জ ২০ শয্যা হাসপাতালে বর্তমানে মোট ৭ জন চিকিৎসক নিয়োগপ্রাপ্ত আছেন। তারা সবাই বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে (সংযুক্ত) দায়িত্ব পালন করছে।

জেলা সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ ইমতিয়াজ বলেন, হাসপাতালের জন্য জমি অধিগ্রহণ করার বিষয়টি পুরোপুরি জেলা প্রশাসন কার্যালয়ের দায়িত্ব। আমরা জেলা প্রশাসককে জায়গার জন্য আবেদন করেছি।

কিন্তু ২০২০ সালে জমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তার চিঠির বিষয়টি তিনি জানেন না বলে দাবি করে বলেন, এমন কোনো চিঠি আমরা পেয়েছি বলে মনে হয় না। চিঠির কপিটি আমাকে হোয়াটসআপ করুন।

নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসক মোস্তাইন বিল্লাহ জানিয়েছেন, আমি নতুন এসেছি। বিষয়টি আমার জানা ছিল না। তবে যেখানে বর্তমান সরকার স্বাস্থ্য সেবায় বদ্ধ পরিকর, সেখানে হাসপাতাল নির্মাণ সরকারি জমির জন্য আটকে থাকবে এটা মানা যায় না। জমি অধিগ্রহণে কোনো জটিলতা থাকলে সেগুলো আমরা দ্রুততার সঙ্গে সম্পন্ন করবো।

তিনি জানান, সিভিল সার্জনের সঙ্গে এই বিষয়ে কথা বলবো। বিষয়টি জেনে তারপর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।