মাকে খুন করলেন বাবা, ছেলেকে সৎ ভাই

জনপদ ডেস্ক: রাজধানীর বাড্ডা থানাধীন আফতাবনগরে নিজ বাসায় চার বছর আগে খুন হন এ কে এম মনজিল হক। খুনিরা তাকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে গলা কেটে, পেটে খুঁচিয়ে এবং হাত ও পায়ের রগ কেটে নৃশংসভাবে হত্যা করে। এরপর হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত সরঞ্জাম ও রক্তমাখা জামাকাপড় ঘটনাস্থলে ফেলে বাসায় থাকা নিহতের জামাকাপড় পরে পালিয়ে যায় হত্যাকারীরা।

সূত্রবিহীন এই হত্যাকাণ্ডের তদন্তে নেমে প্রথমে কোনো কুলকিনারা করতে পারেনি পুলিশ। পরে মামলার তদন্তভার গ্রহণ করে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ সিআইডি। প্রায় চার বছর তদন্ত শেষে জানা যায়, মনজিল হককে খুন করে তারই সৎ ভাই এ কে এম ইয়াছিন হক।

তিন ভাড়াটে খুনি রবিউল ইসলাম সিয়াম, মাহফুজুল ইসলাম রাকিব, সীমান্ত হাসান তাকবীরকে নিয়ে মনজিলকে হত্যা করেন ইয়াছিন। পাশাপাশি এই হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনার সঙ্গে ইয়াছিনের মা লায়লা ইয়াসমিন লিপি, মামা আবু ইউসুফ ও চাচা ফারুক মিয়া জড়িত রয়েছে বলে জানতে পারে সিআইডি।

রোববার (১৩ জুন) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানায় সিআইডি। সংস্থাটি ইতোমধ্যে ইয়াছিন ও হত্যাকাণ্ডে সরাসরি জড়িত তিন খুনিকে গ্রেপ্তার করেছে। তাদের মধ্যে ইয়াছিনসহ তিনজন ১৬৪ ধারায় এবং তাকবীর ১৬১ ধারায় হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দিও দিয়েছেন।

সিআইডি জানায়, ২০১৭ সালের ১১ ডিসেম্বর আফতাবনগরের পৈত্রিক ফ্ল্যাটে মনজিলকে খুন করেন ইয়াছিন। ওইদিন আনুমানিক বেলা সোয়া ১১ টার দিকে তিন ভাড়াটে খুনির সহযোগিতায় মনজিলকে গলা কেটে হত্যা করেন তিনি। মৃত্যু নিশ্চিত করতে মনজিলের পেটে ছুরি দিয়ে আঘাত ও হাত-পায়ের রগও কেটে দেয় খুনিরা। এই ঘটনায় ওইদিনই রাজধানীর বাড্ডা থানায় বাদী হয়ে একটি হত্যা মামলা করেন নিহত মনজিল ও হত্যাকারী ইয়াছিনের চাচা ফারুক মিয়া। মামলায় অজ্ঞাতনামাদের আসামি করা হয়।

এদিকে ঘটনার দিন সকাল থেকে নিখোঁজ হন নিহতের সৎ ভাই ইয়াছিন। এজন্য রামপুরা থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেন ইয়াছিনের মামা আবু ইউসুফ। পুলিশ এই হত্যাকাণ্ড ও নিখোঁজের রহস্য উদঘাটন করতে না পারায় ২০১৮ সালের ২৪ মার্চ মামলার তদন্তভার গ্রহণ করে সিআইডি। এ সময় মনজিলের খুনিরাই ইয়াছিনকে অপহরণ করে খুন ও লাশ গুম করেছে বলে সিআইডিকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করেন তাদের চাচা ফারুক মিয়া। কিন্তু সিআইডি গোপন সূত্রে জানতে পারে, পরিচয় গোপন করে ইয়াছিন চট্টগ্রামে একটি সংবাদপত্রের জেলা প্রতিনিধি হিসেবে কর্মরত আছে। পরে তথ্যপ্রযুক্তির মাধ্যমে শনাক্ত করে চলতি বছর ১৩ মার্চ চট্টগ্রাম নগরীর শেরশাহ কলোনী থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে। তার তথ্যমতে একদিন পরেই রাজধানীর কোনাপাড়া এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয় আরেক খুনি সিয়ামকে। পরে তাদের দেওয়া তথ্যের ওপর ভিত্তি করে গত ৮ এপ্রিল ডেমরা থেকে রাকিব ও গতকাল শনিবার (১২ জুন) জুরাইন রেলগেট এলাকা থেকে তাকবীরকে গ্রেপ্তার করে সিআইডি।

পুলিশের এই সংস্থাটি জানায়, জিজ্ঞাসাবাদে ইয়াছিন জানিয়েছে, পৈত্রিক সম্পত্তির লোভেই সৎ ভাইকে হত্যা করেছেন তিনি। এ জন্য ঘটনার ৮-১০ দিন আগে ভাড়াটে খুনিদের সরদার সিয়ামকে নিয়ে নিউমার্কেটের ফুটপাত থেকে দুটি ধারালো ছুরি, পাটের রশি ও এগুলো বহনের জন্য একটি রেকসিনের ব্যাগ কিনেন।

ইয়াছিন তার জবানবন্দিতে আরও জানায়, মনজিলকে হত্যার আগের দিন সিয়ামের সঙ্গে গোপন বৈঠক করেন তিনিসহ তার মা লিপি, চাচা ফারুক মিয়া ও মামা আবু ইউসুফ নয়ন। বনশ্রীতে নিজের পৈত্রিক ফ্ল্যাটে এই বৈঠক করা হয়। মনজিলকে হত্যার জন্য সিয়ামকে পাঁচ লাখ টাকা দেওয়ার প্রলভন দেখানো হয়। এছাড়া খুনের কাজে ব্যবহারের জন্য মামা আবু ইউসুফ নয়ন থেকে নেওয়া হয় ২০ হাজার টাকা।

এই মামলা তদন্তকালে সিআইডি জানতে পারে, মনজিলের বয়স যখন ৩-৪ বছর তখন তার বাবা মইনুল হকের সঙ্গে তার খালা লিপির প্রেমের সম্পর্ক গড়ে উঠে। এক পর্যায়ে লিপির প্ররোচণায় মনজিলের মা সাদিয়া পারভীনকে গায়ে আগুন লাগিয়ে হত্যা করে তার বাবা। তবে এই হত্যাকাণ্ডকে তখন দুর্ঘটনা বলে চালিয়ে দেয় মইনুল এবং এক বছর পর লিপিকে বিয়ে করে সংসার শুরু করে।

সিআইডি আরও জানায়, প্রথম স্ত্রীর মৃত্যুর পর দ্বিতীয় স্ত্রী ও তার সন্তান এবং মনজিলকে নিয়ে শান্তিনগর বাজারের পেছনের একটি ফ্ল্যাটে বসবাস শুরু করেন মইনুল। এই ফ্ল্যাটের যৌথভাবে মালিক ছিল মনজিল, ইয়াছিন ও তাদের চাচাতো ভাই ফারুক মিয়ার ছেলে এ কে এম নেওয়াজ। কিন্তু ইয়াছিনের বয়স যখন ১২-১৩ বছর তখন তার বাবা তাদের দুই ভাইয়ের নামে দলিল করে ফ্ল্যাটটি গোপনে বিক্রি করে দেন। সেই টাকার ভাগ চাইলে ফারুক মিয়াকে মাদকাসক্ত বানিয়ে দীর্ঘদিন একটি মাদক নিরাময় কেন্দ্রে আটকে রাখা হয়। এই ক্ষোভের বশেই মনজিল হত্যার পরিকল্পনায় অংশ নেন ফারুক। এছাড়া মৃত মায়ের স্বর্ণালংকারের জন্য একবার ইয়াছিনের মামা আবু ইউসুফকে লাঞ্চিত করেন মনজিল। যার প্রতিশোধ নিতে ইউসুফও মনজিল হত্যার সম্মতি দেন। মনজিল হত্যার পরিকল্পনায় জড়িত থাকার অভিযোগে লিপি, ফারুক মিয়া ও আবু ইউসুফকে গ্রেপ্তার করার বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন আছে বলে জানিয়েছে সিআইডি।