নতুন আতঙ্ক ব্ল্যাক ফাঙ্গাস, ভারতে আক্রান্ত ২৮ হাজারের বেশি

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: করোনাভাইরাসের দ্বিতীয় ঢেউয়ের ধাক্কায় বিপর্যস্ত ভারতে দুই মাস পর দৈনিক সংক্রমণ প্রথমবারের মতো এক লাখের নিচে নেমেছে। করোনার প্রকোপ কমলেও নতুন এক আতঙ্কের বিরুদ্ধে লড়ছে দেশটি; আর এই আতঙ্ক তৈরি হয়েছে ৫৬ শতাংশের বেশি মৃত্যুহারের রোগ মিউকরমাইকোসিস বা ব্ল্যাক ফাঙ্গাস।

সোমবার দেশটির স্বাস্থ্যমন্ত্রী হর্ষ বর্ধণ বলেছেন, বর্তমানে ভারতে ব্ল্যাক ফাঙ্গাসে আক্রান্ত রোগী আছেন ২৮ হাজারের বেশি। কেন্দ্রীয় মন্ত্রীদের সঙ্গে এক বৈঠকে তিনি বলেন, দেশের ২৮টি রাজ্যে এই সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে। এখন পর্যন্ত আমরা ২৮ হাজার ২৫২ জনের ব্ল্যাক ফাঙ্গাস সংক্রমণ শনাক্ত করেছি। ব্ল্যাক ফাঙ্গাসে আক্রান্তদের মধ্যে ৮৬ শতাংশ বা ২৪ হাজার ৩৭০ জনের করোনা সংক্রমিত হওয়ার রেকর্ড আছে। এছাড়া ৬২ দশমিক ৩ শতাংশ বা ১৭ হাজার ৬০১ জনের ডায়াবেটিস। এরপরে ৫ হাজার ৪৮৬ জন ব্ল্যাক ফাঙ্গাস রোগী আছে গুজরাটে। এর পাশাপাশি মধ্যপ্রদেশ, উত্তরপ্রদেশ, রাজস্থান, হরিয়ানা, কর্ণাটক, দিল্লি ও অন্ধ্রপ্রদেশে বেশি সংখ্যক রোগী পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে হর্ষ বর্ধণ।

ব্ল্যাক ফাঙ্গাস কী?

চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় করোনা রোগীদের সুস্থ হয়ে ওঠার পর সংক্রমণজনিত এই রোগকে বলা হয় মিউকরমাইকোসিস। মাইকরমাইসিটিস গোত্রের কয়েকটি ছত্রাক প্রজাতি থেকে ব্ল্যাক ফাঙ্গাস সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ে। শরীর দুর্বল এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে গেলে এই ছত্রাকের সংক্রমণ হতে পারে। এর পাশাপাশি আরও বিভিন্ন কারণে এই ছত্রাকের সংক্রমণ ঘটতে পারে।

কিন্তু নতুন করে যে চিন্তা দেখা দিয়েছে, সেটি হলো— করোনা রোগীদের শরীরে ব্ল্যাক ফাঙ্গাসের সংক্রমণ প্রবল হয়ে উঠছে। বিশেষত যে রোগীদের স্টেরয়েড দিতে হচ্ছে বা যারা আগে থেকেই ডায়াবেটিসে আক্রান্ত তারা দ্রুত সংক্রমিত হচ্ছেন। এছাড়া যে রোগীদের রক্তে শর্করার পরিমাণ বেশি ও স্টেরয়েড থেরাপি নিয়েছেন তাদেরও মিউকরমাইকোসিসের সংক্রমণ ঘটছে।

দিল্লির অল ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউট অব মেডিক্যাল সায়েন্সেসের (এইমস) পরিচালক ড. রণদীপ গুলেরিয়া বলেন, ব্ল্যাক ফাঙ্গাসের সংক্রমণ ঠেকাতে হলে প্রাথমিকভাবে তিনটি বিষয়ের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে— ১. ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ ২. রক্তে শর্করার পরিমাণ নিয়ন্ত্রণে রাখা ৩. স্টেরয়েড বা কর্টিকোস্টেরয়েড জাতীয় ওষুধের সঠিক ব্যবহার।

ভারতের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, করোনাভাইরাসের পর দ্বিতীয় সংক্রমণ হিসেবে মিউকরমাইকোসিস বা কালো ছত্রাকে আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে ৫৬ দশমিক ৭ শতাংশের মৃ্ত্যু হয়েছে। এছাড়া, করোনা রোগীদের চিকিৎসার সময়ে যথেচ্ছ অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধের ব্যবহার রোগীদের শরীরে ‘ড্রাগ রেজিস্ট্যান্স’ বা ওষুধ প্রতিরোধী জীবাণু তৈরি করছে। যা পরবর্তী সময়ে দ্বিতীয়বার ইনফেকশনের জন্য দায়ী।

করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে যারা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন, আরও স্পষ্ট করে বললে হাসপাতালে যাদের অক্সিজেনের প্রয়োজন হচ্ছে, কিংবা স্টেরয়েডের মাধ্যমে চিকিৎসা করা হচ্ছে, তারা পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন ধরনের ছত্রাকজনিত সংক্রমণের শিকার হচ্ছেন। আবার ছত্রাকে সংক্রমণের পর ঠিক সময়ে চিকিৎসা শুরু না হলে সংক্রমিতদের বড় অংশের মৃত্যু হচ্ছে।

ফাঙ্গাস সংক্রমণের উপসর্গ

কিছু কিছু ফাঙ্গাস থেকে সংক্রমণের উপসর্গগুলোর সঙ্গে কোভিড-১৯ রোগীর লক্ষণগুলোর মিল রয়েছে। যেমন জ্বর, কাশি এবং নিঃশ্বাস নিতে না পারা।

ক্যানডিডা ফাঙ্গাসের বাড়তি উপসর্গের মধ্যে রয়েছে সাদা রং-এর র‍্যাশ বা ক্ষত – যার জন্য একে অনেক সময় বলা হয় ‘সাদা ফাঙ্গাস’। নাক, মুখ, ফুসফুস, পাকস্থলি বা নখের গোড়ায় এই ছত্রাকের সংক্রমণ দেখা যেতে পারে, যে র‍্যাশ অনেক সময় সাদা ছানার মত দেখায়।

এই ফাঙ্গাসের সংক্রমণ শরীরে আরও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়লে অর্থাৎ তা রক্তে চলে গেলে প্রায়ই রক্ত চাপ কমে যাওয়া, জ্বর, পেটে ব্যথা এবং মূত্রনালীর প্রদাহের মত উপসর্গ দেখা যায়।

সূত্র: আলজাজিরা, বিবিসি।